তফসিল থেকে প্রচারণা: কেমন ছিল নির্বাচনী অপতথ্য?
দিনটি ছিল শুক্রবার। ১২ ডিসেম্বরের সেই দিনে জুম্মার নামাজের ঠিক পরপরই খবর আসে সংসদ নির্বাচনে ঢাকা-৮ আসনের সম্ভাব্য স্বতন্ত্র প্রার্থী ও ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরিফ ওসমান হাদি রাজধানীর বিজয়নগরে গুলিবিদ্ধ হয়েছেন। উন্নত চিকিৎসার জন্য দেশ থেকে সিঙ্গাপুর নিয়েও হাদিকে বাঁচানো যায়নি, মৃত্যু তাকে আলিঙ্গন করে নেয় এক সপ্তাহ পরই।
হাদি গুলিবিদ্ধ হওয়ার আগের দিন সন্ধ্যায়ই ঘোষণা করা হয় দেশের ১৩তম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল, যা থেকে জানা যায় যে আসছে ১২ ফেব্রুয়ারি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। সেই দিনটিই আগামীকাল। সংসদ নির্বাচনের ভোটগ্রহণের পাশাপাশি একই দিনে গণভোটও হওয়ার কথা রয়েছে। জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন প্রশ্নে এই গণভোটও সমান গুরুত্ব পাচ্ছে।
এমন প্রেক্ষাপটে রিউমর স্ক্যানার দেখতে চেয়েছে, তফসিল ঘোষণা পরবর্তী সময় থেকে প্রার্থীদের আনুষ্ঠানিক প্রচারণাকালীন সময়ের মধ্যে অপতথ্যের প্রবাহ কেমন ছিল। রিউমর স্ক্যানারের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত গেল দুই মাসের নির্বাচন সংক্রান্ত ফ্যাক্টচেকগুলো বিশ্লেষণ করে দেখা যাচ্ছে, এই সময়ে অপতথ্য শনাক্ত হয়েছে ৫৪৫টি। সবমিলিয়ে, ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে নির্বাচন সংক্রান্ত অপতথ্যের ওপর নজরদারি শুরুর পর থেকে গেল ৯ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত সর্বমোট ৭৫৭টি অপতথ্য শনাক্ত করেছে রিউমর স্ক্যানার।
প্রচারণাকালে বেশি অপতথ্য
নির্বাচনের আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম শুরুর পর (গত বছরের ১১ ডিসেম্বর) যে ৫৪৫টি অপতথ্য শনাক্ত হয়েছে তার মধ্যে তফসিল ঘোষণার পর থেকে ২১ জানুয়ারি পর্যন্ত পাওয়া গেছে ২১৭টি, আর প্রচারণা শুরুর পর ৯ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত শনাক্ত হয়েছে ৩২৮টি অপতথ্য-যা দেখায় প্রচারণাকালেই অপতথ্যের প্রবাহ সবচেয়ে বেশি ছিল। এই সময়ের মধ্যে গণভোট নিয়ে অপতথ্য শনাক্ত হয়েছে অন্তত ২৩টি।
ডিসেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারির উল্লিখিত সময়ের মধ্যে ৫১ জন সংসদ সদস্য পদপ্রার্থী সরাসরি অপতথ্যের শিকার হয়েছেন, যাদের নিয়ে ছড়ানো হয়েছে মোট ৩৫২টি ভুয়া বা বিভ্রান্তিকর তথ্য। ভুক্তভোগীদের বড় অংশই পুরুষ-৪৯ জন। পুরুষ প্রার্থীদের লক্ষ্য করে ৩৪০টি অপতথ্য ছড়ানো হয়েছে। নারীদের ক্ষেত্রে ২ জন প্রার্থীকে নিয়ে ১২টি অপতথ্য শনাক্ত হয়েছে।
পুরুষ প্রার্থীদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি অপতথ্যের শিকার হয়েছেন বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান, যিনি এবার ঢাকা-১৭ ও বগুড়া-৬ আসন থেকে নির্বাচনে লড়ছেন। আর নারী প্রার্থীদের মধ্যে ঢাকা-৯ আসনের তাসনিম জারা ও ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনের রুমিন ফারহানাকে নিয়ে বেশি অপতথ্য ছড়ানো হয়েছে। এরা দুজনই এবার স্বতন্ত্র হিসেবে প্রার্থী হয়েছেন।
এবার ৪৭টি সংসদীয় আসনে অপতথ্যের প্রবাহ লক্ষ্য করা গেছে। এসব আসনে মোট ১২৯টি অপতথ্য ছড়িয়েছে। আসনভিত্তিক হিসাবে সবচেয়ে বেশি অপতথ্য শনাক্ত হয়েছে ঢাকা-৮ আসনে, যেখানে মোট ৫১টি অপতথ্য পাওয়া গেছে।
অপতথ্যে ফটোকার্ড ছিল বড় অস্ত্র
অপতথ্য ছড়ানোর ক্ষেত্রে ফেসবুকই ছিল সবচেয়ে প্রভাবশালী প্ল্যাটফর্ম-এখানেই শনাক্ত হয়েছে ৫৩৫টি ভুয়া বা বিভ্রান্তিকর কনটেন্ট। এরপর রয়েছে টিকটক (৮৫টি) ও ইনস্টাগ্রাম (৭৬টি), যা দেখায় ভিজ্যুয়ালভিত্তিক প্ল্যাটফর্মগুলোতেও অপতথ্যের বিস্তার উল্লেখযোগ্য।
ধরণভেদে বিশ্লেষণে দেখা যায়, সবচেয়ে বেশি অপতথ্য ছড়ানো হয়েছে ফটোকার্ডের মাধ্যমে (২৮৫টি) এবং ভুয়া ও সম্পাদিত বক্তব্য ব্যবহার করে (২৫৪টি)। পাশাপাশি এআই-ডিপফেক কনটেন্টের সংখ্যা ছিল ৭৭টি, যা প্রযুক্তিনির্ভর বিভ্রান্তির বাড়তি ঝুঁকি তুলে ধরে।
অপতথ্যের লক্ষ্যবস্তুতে বিএনপি-তারেক রহমান
দলভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)-কে ঘিরেই সবচেয়ে বেশি অপতথ্য ছড়ানো হয়েছে। মোট শনাক্ত ৩৬০টি অপতথ্যের মধ্যে ৮১ শতাংশই ছিল নেতিবাচক।
এ সময়ে বিএনপির ১৪ জন সংসদ সদস্য পদপ্রার্থী সরাসরি অপতথ্যের শিকার হয়েছেন, যাদের নিয়ে ছড়ানো হয়েছে মোট ১৭২টি বিভ্রান্তিকর কনটেন্ট। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি লক্ষ্যবস্তু ছিলেন তারেক রহমান-তাকে নিয়ে পাওয়া গেছে ১৩৩টি অপতথ্য, যার ৮৬ শতাংশই ছিল নেতিবাচক।